ইসির প্রনীত জ্যেষ্ঠতা তালিকায় বৈষম্য-অনিয়মে তীব্র অসন্তোষ
নির্বাচন কমিশনের কতিপয় সুবিধাবাদী কর্মকর্তার ফাঁদে পড়ে বৈষম্যপূর্ণ একটি গ্রেডশন তালিকা অনুমোদন দিয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দিন ও চুক্তিভিত্তিক ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
## সিইসি ও সচিবের মনগড়া গ্রেডশন তালিকা
## চার নির্বাচন কমিশনার কিছুই জানেন না
নির্বাচন কমিশনের কতিপয় সুবিধাবাদী কর্মকর্তার ফাঁদে পড়ে বৈষম্যপূর্ণ একটি গ্রেডশন তালিকা অনুমোদন দিয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দিন ও চুক্তিভিত্তিক ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে চার নির্বাচন কমিশনের অনুমিত নেওয়া হয়নি। একাধিক নির্বাচন কমিশনার স্বীকার করেছেন, তারাও সাংবাদিক কিংবা বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এই তথ্যটি জেনেছেন। তবে এ বিষয়ে কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। ফলে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের মতো বিএনপির ইমেজ ক্ষুন্ন করতে নতুন করে গ্রেডশন তালিকা প্রণয়ন করে সরকারকে বিতর্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন সিইসি ও সচিব।
সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের আওতাধীন প্রথম শ্রেণির (৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব) কর্মকর্তাদের পুনরায় প্রকাশিত চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতা তালিকা বৈষম্যপূর্ণ। এই তালিকায় সিনিয়র কর্মকর্তারা জুনিয়রদের নিচে নেমে গেছেন অর্থাৎ সিনিয়র কর্মকর্তাদের পদ অদবনত হয়েছে। এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে ইসিতে। বৈষম্যপূর্ন এই মনগড়া জ্যেষ্ঠ্যতার তালিকা চ্যালেঞ্জ করে সংক্ষুদ্ধরা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারণ গত ১৬ মার্চ বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত এ তালিকাটি ‘অনিয়ম, বিধিবহির্ভূত প্রক্রিয়া ও বৈষম্যমূলক ভাবে চূড়ান্ত করা হযেছে। সংক্ষুদ্ধ কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন, ২০০৯ ও নির্বাচন কমিশন (কার্যপ্রণালী) বিধিমালা, ২০১০ অনুসারে কমিশনের সিদ্ধান্ত ব্যতীত এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। পূর্বে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের জৈষ্ঠ্যতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের সকল কমিশনারের অনুমোদন নেয়া হয়েছে। কিন্তু এইবার বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করে উপসচিব পর্যায় থেকে নথি উপস্থাপন করে শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে ঈদের ছুটির ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে তালিকাটি প্রকাশ করা হয়েছে । এক্ষেত্রে অনিয়মে সহায়ক ভূমিকা হিসেবে নেপথ্যে থেকে কাজ করেছে যুক্তি বহাল রাখতে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। এক্ষেতে অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের মতামত নেওয়া হয়নি। সিইসি বাদে সব কমিশনার ক্ষুদ্ধ। একাধিক নির্বাচন কমিশনার নতুন প্রণীত গ্রেডেশন তালিকার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে স্বীকার করেন। কমিশনে তারা বিষয়টি তুলবেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১১ সালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠ পর্যায়ের কার্যালয়ের দুই ধারার কর্মকর্তাকে একীভূত করার পর সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা, ২০১১ প্রযোজ্য করা হয়। সেই অনুযায়ী ২০১৬ সালের ১৩ জুন প্রথম শ্রেণির চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়ন ও ১৬ জুন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়, যার ভিত্তিতেই দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেড প্রদান করা হয়েছে।
তবে নতুন প্রকাশিত তালিকার ২ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক কর্মকর্তা নন-ক্যাডার জ্যেষ্ঠতা বিধিমালা জারির পূর্বে যোগদান করেছেন—যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, ২০১১ সালের একীভূতকরণের পর থেকেই সম্মিলিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে ওই বিধিমালা কার্যকর হওয়ার কথা।
এছাড়া, মাঠ পর্যায় ও সচিবালয়ের পদসমূহকে ‘সমপদ’ হিসেবে দেখিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী পৃথক নিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক মর্মে প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সহকারী সচিব ও জেলা নির্বাচন অফিসার পদ পৃথকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও নতুন তালিকায় তা উপেক্ষা করা হয়েছে।তালিকাটি খসডায় নন ক্যাডার জেষ্ঠতা বিধিমালা অনুসরন করে খসড়া প্রকাশ করলেও চূড়ান্ত করলে ১৯৭০ এর জেষ্ঠ্যতা নীতিমালা অনুসরন করে প্রকাশ করা হয়। এখানেও আইনের ব্যত্যয় দেখা যায়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ সালের তালিকা প্রণয়নের সময় ১৯৭০ সালের “জ্যেষ্ঠতার সাধারণ নীতিমালা” অনুসরণ করা হলেও ২০২৬ সালের তালিকায় সেই নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ ধারা—বিশেষ করে সমপদে না থাকা কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিধান—অনুসরণ করা হয়নি।
সবচেয়ে বড় বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ও বিভাগীয় পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে। এছাড়াও ২০০৫ সালের পূর্বে সরাসরি প্রথম শ্রেণিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরবর্তীতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপরে থাকার কথা থাকলেও নতুন তালিকায় উল্টো তাদের নিচে স্থান দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ক্রমিক ১৪, ১৫ এবং ২৯৮-৩০১ নম্বর কর্মকর্তাদের ২০০৫ সালে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জুনিয়র দেখানো হয়েছে, যা প্রচলিত নীতিমালার পরিপন্থি।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে চাকরিচ্যুত হয়ে পুনর্বহাল হওয়া ৮৫ জন কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের আদেশে তাদের চাকরিচ্যুত সময়কালসহ পূর্ণ জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও, ২০১৬ সালের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে সম্পূর্ণ নতুন তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে—যা আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থি ।
নতুন জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্বে মামলায় বাদী পক্ষ থাকা এবং দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে দায়িত্বে রেখে কর্মকর্তাদের জেষ্ঠ্যতার তালিকার প্রনয়নে জড়িত ছিলো যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট ও পরবর্তী আপিল নিষ্পত্তির পর দীর্ঘদিন তা কার্যকর ছিল এবং এর ভিত্তিতেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফলে সেটিকে একটি প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর তালিকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়ন না করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ২০১৬ সালের তালিকায় সংশোধন আনাই যুক্তিসঙ্গত ছিল। বর্তমান তালিকায় নন-ক্যাডার বিধিমালা, ২০১১ এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ জ্যেষ্ঠতা নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় এটি আইনি ও প্রশাসনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।